ধারা মুখস্থ রাখার পাঁচ সূত্র

ধারা মুখস্থ রাখার পাঁচটি সূত্র

অনেকেই অভিযোগ করেন, তারা কিছুতেই ধারা মুখস্থ রাখতে পারেন না। এ বিষয়ে আমার মন্তব্য হলো, যদি আপনি মুখস্ত করেন নিশ্চিত আপনি ফেল!

খেয়াল করুন, আমি বলছি না যে, ধারা মুখস্থ রাখা প্রয়োজন নেই; বরং বলছি যে, ধারা মুখস্থ করার চেষ্টা করবেন না। মনে রাখবেন, যেগুলো আপনি মুখস্থ করবেন, সেগুলো ভুলে যাবেন; যতবার মুখস্থ করবেন, ততবার ভুলে যাবেন। আজ আমি আপনাদের এমন পাঁচটি সূত্র দিব যেগুলো অনুসরণ করলে ধারাগুলো আপনাকে মুখস্থ করতে হবে না; বরং প্রাকৃতিকভাবেই আপনার মাথায় গেঁথে যাবে।

সূত্র ১: ধারাবাহিকতা রক্ষা করে পড়া

“অ্যাডভোকেটশীপ পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নিবেন?” প্রবন্ধে আমি বলেছি পরীক্ষা প্রস্তুতির দ্বিতীয় ধাপ হল ‘খুঁটি গাড়া’। প্রত্যেকটি আইনেই এমন অনেক ধারা আছে যেগুলো বিষয়ভিত্তিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে পড়তে হবে। এগুলো চিহ্নিত করে শুরু ও শেষের ধারাতে খুঁটি গেঁড়ে নিতে হবে।

উদাহরণস্বরূপ, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৩৯ ও ৩৪০ ধারায় অবৈধ বাধা এবং অবৈধ আটক অপরাধের সংজ্ঞা দেয়া আছে। ‘অবৈধ বাধা’ মানে কাউকে নির্দিষ্ট দিকে যেতে না দেয়া এবং ‘অবৈধ আটক’ মানে কাউকে চারদিক থেকে যাওয়া বন্ধ করে দেয়া।

একইভাবে, ‘বলপ্রয়োগ’, ‘অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ’ এবং ‘আক্রমণ’ অপরাধের সংজ্ঞা যথাক্রমে ৩৪৯, ৩৫০ এবং ৩৫১ নম্বর ধারায় দেয়া আছে। আবার, ‘অপহরণ’, ‘বাংলাদেশ থেকে অপহরণ’ এবং ‘আইনগত অভিভাবকের হেফাজত থেকে অপহরণ’ অপরাধ তিনটির সংজ্ঞা ৩৫৯ থেকে ৩৬২ ধারায় উল্লেখিত রয়েছে। এই অপরাধগুলো ধারাবাহিকভাবে বুঝে পড়লে ধারা নম্বর মুখস্থ করতে হয় না; এগুলো স্বাভাবিকভাবেই মুখস্থ হয়ে যায়।

আবার, দণ্ডবিধির ২৯৯ থেকে ৩৭৪ ধারা পর্যন্ত ধারাবাহিক অপরাধের সংজ্ঞার সবগুলোই ৯ অংকে শুরু। ২৯৯ ধারায় হত্যার সংজ্ঞা, ৩১৯ ধারায় আঘাতের সংজ্ঞা, ৩৩৯ অবৈধ বাধা, ৩৪৯ বলপ্রয়োগ এবং ৩৫৯ অপহরণ। ৯ অংকটি মাথায় রেখে ধারাবাহিকতা রক্ষা করলেই বেশিরভাগ ধারা মুখস্থ হয়ে যাবে।

সূত্র ২: ধারার মধ্যে তুলনা করে পড়া

অ্যাডভোকেটশীপ পরীক্ষায় এমন কিছু ধারার পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন আসে, যেগুলো তুলনামূলকভাবে বোঝা জরুরি। এসব ধারা তুলনা করে পড়তে হয়। বারবার তুলনা করতে গেলে এগুলো ভুলে যাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। যেমন, দণ্ডবিধির ২৯৯ ধারায় ‘নিন্দনীয় নরহত্যা’ এবং ৩০০ ধারায় ‘নিন্দনীয় নরহত্যা’ কখন ‘খুন’ হবে তা আলোচনা করা হয়েছে। আবার সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন ১৮৭৭ এর ৮ ধারায় ‘স্থাবর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার’ এবং ৯ ধারায় ‘অস্থাবর সম্পত্তি হতে বেদখলকৃত ব্যক্তি কর্তৃক মোকদ্দমা’ দায়ের সম্পর্কিত বিধান দেয়া আছে। এগুলোর পার্থক্য এত সূক্ষ্ম যে, পড়তে গেলে মনে হবে ধারাগুলোর মধ্যে কোন পার্থক্যই নেই।

এছাড়া, তামাদি আইনের ১২ ও ১৪ ধারা এবং সাক্ষ্য আইনের ৩০, ১৩৩ ও ১১৪(খ) ধারাগুলোকেও উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়।

সূত্র ৩: সূত্র মেনে রিভিশন দেয়া

“অ্যাডভোকেটশীপ পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নিবেন?” প্রবন্ধে আমি পাঁচটি ধাপে পরীক্ষা প্রস্তুতির বিষয়ে আলোচনা করেছি। ওই পাঁচটি ধাপের সর্বশেষ ধাপ হলো ‘অনুশীলন’ বা ‘রিভিশন। রিভিশন পর্যায়ে আসার আগে অবশ্যই আগের চারটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।

“অ্যাডভোকেটশীপ পরীক্ষা: রিভিশন দেয়ার কার্যকর কৌশল” শিরোনামে আমি একটি আলাদা প্রবন্ধ লিখেছি। সেখানে রিভিশনের পাঁচটি সূত্র দেয়া হয়েছে:

১. ধারাবাহিকতার সূত্র মেনে রিভিশন করা,
২. তুলনামূলক অধ্যয়নের সূত্র মেনে রিভিশন করা,
৩. কঠিন ও ব্যতিক্রমী প্রশ্নের ওপর নজর রাখা,
৪. বারবার পড়া এবং মডেল টেস্টের মাধ্যমে রিভিশন দেয়া,
৫. মুখস্থ করার চেষ্টা না করে স্বাভাবিক মুখস্থ হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়া।

সূত্র ৪: সূত্র মেনে মডেল টেস্ট দেয়া

বর্তমান সময়ে অ্যাডভোকেটশীপ পরীক্ষায় কতগুলো ধারা মুখস্থ করেছেন, সেটা যাচাই করা হয় না; বরং দেখা হয় আপনি আইনটি পড়েছেন কিনা এবং পড়ার সময় আপনার সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ছিল কিনা।

প্রত্যেকবার রিভিশন দেয়ার পর একবার মডেল টেস্ট দেয়া উচিত। বাজারে প্রচুর মডেল টেস্ট বই পাওয়া যায়। তবে চেষ্টা করুন জটিল ধারাগুলো থেকে নিজেই মডেল টেস্ট তৈরি করতে। এতে ধারাগুলো সহজেই আয়ত্তে আসবে এবং স্বাভাবিকভাবেই মুখস্থ হবে।

মডেল টেস্ট দেয়ার দুইটি উপকার রয়েছে। এতে নিজেকে যাচাই করা যায় এবং বারবার মডেল টেস্ট দেয়ার ফলে অনেকগুলো ধারা নিজে থেকেই মুখস্থ হয়ে যায়।

সূত্র ৫: দণ্ডবিধির শাস্তি মুখস্থ করবেন না

দণ্ডবিধির শাস্তি মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। সাধারণত লিখিত পরীক্ষায় শাস্তি সম্পর্কিত প্রশ্ন আসে না। এমসিকিউ পরীক্ষায় কিছু কৌশলগত প্রশ্ন আসতে পারে তবে তা সর্বোচ্চ পাঁচ নম্বরের বেশি হবে না। এই পাঁচ নম্বরের জন্য দণ্ডবিধির শাস্তি মুখস্থ না করে, অন্য আইনের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে আপনি তার চেয়ে বেশি নম্বর পেতে পারেন।

শাস্তির ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষ্যনীয়, দণ্ডবিধির বেশিরভাগ কারাদণ্ডই যেকোনো বর্ণনার। তবে দস্যুতা, ডাকাতি, দস্যুতার প্রস্তুতি নিয়ে চুরি ইত্যাদি অপরাধে কারাদণ্ড মানেই সশ্রম। আবার আত্মহত্যার প্রচেষ্টা, মানহানি বা জনসমাগম স্থানে মাতলামি ইত্যাদির শাস্তি সবসময় বিনাশ্রম। আবার থাগ বা ঠগের একমাত্র শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। শাস্তির ক্ষেত্রে এগুলো ব্যতিক্রম। শাস্তির ধারাগুলো পড়ার সময় ব্যতিক্রম বিষয়গুলো খেয়াল করে পড়তে হবে।

কিছু শাস্তি এমনিতেই মুখস্থ হয়ে যাবে। যেমন, এসিড দিয়ে মুখ ঝলসানো বা দুই চোখ উপড়ে ফেলার শাস্তি সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড, খুনের শাস্তি সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড ও সর্বনিম্ন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এগুলো মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই; এগুলো সাধারণ জ্ঞান দিয়েই মনে রাখা সম্ভব।

মিফতাহুর রহমান, অ্যাডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট


Discover more from আইনের উন্মুক্ত পাঠশালা

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

একটি মন্তব্য করুন ⤵️

×
পরামর্শ প্রয়োজন? এখানে চাপুন!