দেওয়ানী কার্যবিধির পরিচিতি ও মৌলিক বিষয়াবলী

দেওয়ানি কার্যবিধির পরিচিতি ও মৌলিক বিষয়াবলী

১৯০৮ সালের ২১ মার্চ দেওয়ানি কার্যবিধি পাশ করা হয়। দেওয়ানি আদালতের বিচারকার্যের পদ্ধতি সম্পর্কিত আইনসমূহ সংহত এবং সংশোধন করে একটি একক ও সুসংহত আইন প্রণয়ন করার উদ্দেশ্যে এটি প্রণীত হয়।

দেওয়ানি কার্যবিধি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

◉ দেওয়ানি কার্যবিধি একটি পদ্ধতিগত আইন (Procedural Law);

◉ দেওয়ানি কার্যবিধি সম্পর্কিত প্রথম বিধিবদ্ধ (Codified) আইন প্রণীত হয় ১৮৫৯ সালে;

◉ বর্তমানে বলবৎ ‘দেওয়ানি কার্যবিধি’ পাশ করা হয় ১৯০৮ সালের ২১ মার্চ;

◉ এটি ১৯০৮ সালের ৫ নং আইন;

◉ ১৯০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয় (ধারা-১);

◉ সর্বশেষ সংশোধন করা হয়েছে ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি;

◉ কোন বিশেষ আইন বা যে কোন আইনবলে বিশেষ বিচারিক এখতিয়ার বা ক্ষমতা অর্পিত থাকলে এই আইন তা খর্ব করবে না (ধারা-৪ (১));

◉ বিশেষ আইনের বিধান দেওয়ানি কার্যবিধির সঙ্গে সংঘর্ষিক হলে বিশেষ আইন প্রাধান্য পাবে; তবে দেওয়ানি কার্যবিধিতে বিশেষ আইনবিরোধী নির্দিষ্ট কোন বিধান (any specific provision to the contrary) থাকলে তা প্রাধান্য পাবে (ধারা-৪ (১));

◉ কৃষিজমির উৎপাদন থেকে ভাড়ার অধিকার দেওয়ানি কার্যবিধি দ্বারা খর্ব হবে না (ধারা-৪ (২));

◉ দেওয়ানি কার্যবিধির সাথে ৫টি তফসিল সংযুক্ত আছে, যার মধ্যে ৩টি কার্যকর ও ২টি বাতিল।

দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর সার-সংক্ষেপ

মূল আইনে মোট ১৫৮টি ধারা রয়েছে। ধারা ১৫৬ থেকে ১৫৮ পর্যন্ত বাতিল হওয়ায় দেওয়ানি কার্যবিধিতে মোট ১৫৫টি ধারা আছে বলে কেউ কেউ মত দেন। এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শেষের তিনটি ধারা ছাড়াও এ আইনে আরো কিছু ধারা বাতিল করা হয়েছে এবং কিছু নতুন ধারা সংযুক্তও হয়েছে।

বাতিল ধারাসমূহ: ৮, ২৫, ২৮, ৪০, ৪৪, ৪৫, ৪৭, ৭৬, ৮৭ক, ৮৯, ১০০-১০৩, ১১১ক, ১২৫, ১২৯-১৩১, ১৫৬-১৫৮।

সংযুক্ত ধারাসমূহ: ২৪ক, ৩৫ক, ৩৫খ, ৪৪ক, ৮৬ক, ৮৯ক, ৮৯খ, ৮৯গ, ৮৯ঘ, ৮৯ঙ, ১৩৫ক।

মূল আইনের খণ্ডসমূহ ও প্রাসঙ্গিক বিষয়

দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮ মোট এগারটি খণ্ডে বিভক্ত। এ আইনের প্রারম্ভিক অংশকে বিভাজিত ১১ খণ্ডের বাইরে রাখা হয়েছে।

প্রারম্ভিক অংশ (ধারা ১-৮): আইনটির শিরোনাম, কার্যকারিতা শুরুর তারিখ, প্রয়োগ ক্ষেত্র এবং বিভিন্ন সংজ্ঞা সংক্রান্ত বিধান।

ধারা ১: শিরোনাম, কার্যকারিতা শুরুর তারিখ ও আঞ্চলিক প্রযোজ্যতা।

ধারা ২: বিভিন্ন সংজ্ঞা যা আইনটি বোঝার জন্য সহায়ক।

ধারা ৬: আর্থিক এখতিয়ার বা মামলা দায়েরের জন্য আদালতের আর্থিক সীমা নির্ধারণ।

প্রথম খণ্ড: সাধারণভাবে মোকদ্দমা (ধারা ৯-৩৫খ): দেওয়ানি আদালতের আইনগত ও আঞ্চলিক এখতিয়ার, রেস জুডিকাটা, মামলার দায়ের, সমন ইত্যাদি বিধান।

ধারা ৯: আইনে বাধা না থাকলে আদালত সকল দেওয়ানি মোকদ্দমা বিচার করবে।

ধারা ১০: একই বিষয়ে দুটি মোকদ্দমা থাকলে পরবর্তী মোকদ্দমা স্থগিত হবে।

ধারা ১১: রেস জুডিকাটা নীতি, পুনরায় মামলা থেকে বিরত রাখার জন্য।

ধারা ১৫-২০: আঞ্চলিক এখতিয়ার সম্পর্কিত বিধান।

ধারা ২১-২৪ক: মোকদ্দমা বদলি বা স্থানান্তর সম্পর্কিত বিধান।

ধারা ২৭, ২৯, ৩১ ও ৩২: বিবাদী ও সাক্ষীর সমন সম্পর্কিত বিধান।

ধারা ৩০: উদঘাটন, অনুসন্ধান এবং অনুরূপ আদেশ প্রদানের ক্ষমতা।

ধারা ৩৩: রায় ও ডিক্রি।

ধারা ৩৪: সুদ সম্পর্কিত বিধান।

ধারা ৩৫-৩৫খ: ক্ষতিপূরণ ও খরচ সম্পর্কিত বিধান।

দ্বিতীয় খণ্ড: ডিক্রি জারী (ধারা ৩৬-৭৪): ডিক্রি জারির নিয়মাবলী, গ্রেফতার, সম্পত্তি ক্রোক ও বিক্রয় এবং সম্পত্তির বিক্রিত অর্থ বিতরণসহ ডিক্রি জারির সামগ্রিক প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হয়েছে।

তৃতীয় খণ্ড: আনুষঙ্গিক কার্যধারা (ধারা ৭৫-৭৮): এ অংশে কমিশন ইস্যু এবং বিদেশী আদালতের কমিশন সম্পর্কিত বিধান রয়েছে।

চতুর্থ খণ্ড: নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মোকদ্দমা (ধারা ৭৯-৮৮): সরকার ও সরকারি কর্মকর্তা, বিদেশি শাসক বা দূতাবাসের কর্মকর্তা এবং স্বার্থবিহীন মোকদ্দমার বিধান।

পঞ্চম খণ্ড: বিশেষ কার্যপ্রণালী (ধারা ৮৯-৯৩): বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি (সালিশি, মধ্যস্থতা), গণ উৎপাত ও জনকল্যাণমূলক মোকদ্দমা এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ সংক্রান্ত বিধান।

ষষ্ঠ খণ্ড: সম্পূরক কার্যধারা (ধারা ৯৪-৯৫): মামলা চলাকালীন বিভিন্ন সম্পূরক কার্যধারা, রায়ের পূর্বে গ্রেফতার বা ক্রোক আদেশ ইত্যাদি এবং অসত্য মোকদ্দমার জন্য ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিধান।

সপ্তম খণ্ড: আপিল (ধারা ৯৬-১১২): ডিক্রি ও আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের পদ্ধতি ও আপিল আদালতের ক্ষমতা।

অষ্টম খণ্ড: রেফারেন্স, রিভিউ ও রিভিশন (ধারা ১১৩-১১৫):

ধারা ১১৩: হাই কোর্টে রেফারেন্স।

ধারা ১১৪: রিভিউ।

ধারা ১১৫: রিভিশন।

নবম খণ্ড: হাই কোর্ট সম্পর্কিত বিশেষ বিধান (ধারা ১১৬-১২০): হাই কোর্টের জন্য নির্দিষ্ট কিছু বিধান।

দশম খণ্ড: বিধি প্রণয়ন (ধারা ১২১-১৩১): বিধি প্রণয়ন ও প্রথম তফসিলের কার্যকারিতা সম্পর্কিত বিধান এবং সুপ্রিম কোর্টকে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা প্রদান।

একাদশ খণ্ড: বিবিধ (ধারা ১৩২-১৫৮): বিচার সংক্রান্ত বিবিধ বিষয়াবলী, আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (ধারা ১৫১) এবং রায়, ডিক্রি ও আদেশের সংশোধন সম্পর্কিত বিধান।

সংক্ষেপে তফসিল পরিচিতি

দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এর ৫টি তফসিলের মধ্যে দ্বিতীয়চতুর্থ তফসিল বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে প্রথম, তৃতীয় ও পঞ্চম তফসিল বলবৎ আছে।

প্রথম তফসিল: এ তফসিলে ৫১টি আদেশ রয়েছে, যার মধ্যে ৫১ নম্বর আদেশটি বাতিল হয়েছে এবং ২৭ক নম্বর আদেশ নতুন করে সংযুক্ত হয়েছে। বলবৎ আদেশগুলোতে প্রায় ৫৯৮টি বিধি রয়েছে।

আদেশ-০১: মামলার পক্ষসমূহ

আদেশ-০২: মামলা গঠন

আদেশ-০৩: স্বীকৃত প্রতিনিধি ও আইনজীবী

আদেশ-০৪: মোকদ্দমা রুজু

আদেশ-০৫: সমন ইস্যু ও জারি

আদেশ-০৬: সাধারণভাবে আরজি বা লিখিত জবাব

আদেশ-০৭: আরজি

আদেশ-০৮: লিখিত জবাব ও পারস্পরিক দায়শোধ (Set-off)

আদেশ-০৯: পক্ষসমূহের হাজিরা এবং হাজির না থাকার ফলাফল

আদেশ-১০: আদালত কর্তৃক পক্ষসমূহের জবানবন্দী গ্রহণ

আদেশ-১১: উদঘাটন ও পরিদর্শন

আদেশ-১২: স্বীকৃতি

আদেশ-১৩: দলিলাদি দাখিল, আটক ও ফেরত

আদেশ-১৪: বিচার্য বিষয় গঠন এবং আইনগত বিষয় বা সম্মতি অনুযায়ী মামলা নির্ধারণ

আদেশ-১৫: প্রথম শুনানিতে মোকদ্দমা নিষ্পত্তি

আদেশ-১৬: সাক্ষীদের সমন এবং হাজিরা

আদেশ-১৭: মূলতবি (সময়ের আবেদন)

আদেশ-১৮: মোকদ্দমার শুনানি এবং সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ

আদেশ-১৯: হলফনামা

আদেশ-২০: রায় ও ডিক্রি

আদেশ-২১: আদেশ ও ডিক্রি জারি

আদেশ-২২: পক্ষসমূহের মৃত্যু, বিবাহ, অস্বচ্ছলতা

আদেশ-২৩: মোকদ্দমা প্রত্যাহার ও রায়

আদেশ-২৪: আদালতে অর্থ জমা

আদেশ-২৫: খরচের জন্য জামানত

আদেশ-২৬: কমিশন

আদেশ-২৭: সরকার বা সরকারি ক্ষমতায় কর্মকর্তা কর্তৃক বা বিপক্ষে মোকদ্দমা

আদেশ-২৭ক: সাংবিধানিক আইনের ব্যাখ্যার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত বিষয়ে মোকদ্দমা

আদেশ-২৮: স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্য কর্তৃক বা বিপক্ষে মোকদ্দমা

আদেশ-২৯: করপোরেশন কর্তৃক বা বিপক্ষে মোকদ্দমা

আদেশ-৩০: ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নিজ নাম ব্যবহার না করে ব্যবসা করা ব্যক্তি কর্তৃক বা বিপক্ষে মোকদ্দমা

আদেশ-৩১: ট্রাস্টি, নির্বাহী ও প্রশাসক কর্তৃক মোকদ্দমা

আদেশ-৩২: নাবালক ও অপ্রকৃতিস্থ ব্যক্তি কর্তৃক বা বিপক্ষে মোকদ্দমা

আদেশ-৩৩: নিঃস্ব ব্যক্তি কর্তৃক মোকদ্দমা

আদেশ-৩৪: স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক সম্পর্কিত মোকদ্দমা

আদেশ-৩৫: স্বার্থবিহীন মোকদ্দমা (Interpleader Suit)

আদেশ-৩৬: বিশেষ ধরনের মামলা

আদেশ-৩৭: হস্তান্তরযোগ্য দলিল (Negotiable Instruments) সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত কার্যপ্রণালী

আদেশ-৩৮: রায়ের পূর্বে গ্রেপ্তার ও ক্রোক

আদেশ-৩৯: অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ

আদেশ-৪০: তত্ত্বাবধায়ক (রিসিভার) নিয়োগ

আদেশ-৪১: মূল ডিক্রি থেকে আপিল

আদেশ-৪২: আপিল ডিক্রি থেকে আপিল
(বি. দ্র. – মূল আইনে আপিল ডিক্রি থেকে আপিল সংক্রান্ত ধারা ১০০-১০৩ বাতিল হওয়ায় বর্তমানে এই আদেশটি কার্যকর নয়)

আদেশ-৪৩: আদেশ থেকে আপিল

আদেশ-৪৪: নিঃস্ব ব্যক্তির আপিল

আদেশ-৪৫: আপিল বিভাগে আপিল

আদেশ-৪৬: অভিমত গ্রহণ (রেফারেন্স)

আদেশ-৪৭: পুনর্বিবেচনা (রিভিউ)

আদেশ-৪৮: বিবিধ

আদেশ-৪৯: হাইকোর্ট বিভাগ

আদেশ-৫০: ক্ষুদ্র বিষয়ক আদালত

আদেশ-৫১: বাতিল

তৃতীয় তফসিল: ধারা ৬৯-এর অধীনে কালেক্টর কর্তৃক ডিক্রি জারি সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। এ তফসিলে আদেশ নেই, তবে ১৩টি বিধি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

পঞ্চম তফসিল: এ তফসিলের মাধ্যমে কোর্ট ফি অ্যাক্ট, ১৮৭০-এর অনুচ্ছেদ ১, ১১, এবং ১৯-এ কয়েকটি সংশোধনী আনা হয়েছে।

মিফতাহুর রহমান, অ্যাডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট


Discover more from আইনের উন্মুক্ত পাঠশালা

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

একটি মন্তব্য করুন ⤵️

×
পরামর্শ প্রয়োজন? এখানে চাপুন!