নাবালকের পক্ষে বা বিপক্ষে মোকদ্দমা

তামাদি আইন ১৯০৮-এর ধারা ৬ অনুসারে নাবালক, উন্মাদ ও জড়বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিরা আইনগতভাবে অক্ষম। আইনগতভাবে অক্ষম ব্যক্তি নিজে কোনো দেওয়ানি মামলার বাদী বা বিবাদী হতে পারেন না। তবে তাদের পক্ষে প্রাপ্তবয়স্ক যে কোনো ব্যক্তি ‘নিকটবর্তী বন্ধু’ হয়ে বাদী এবং ‘মোকদ্দমার অভিভাবক’ হয়ে বিবাদী হিসেবে মোকদ্দমা পরিচালনা করতে পারেন।

নাবালক
(Minor)

১৮৭৫ সালের সাবালকত্ব আইনের ধারা ৩ অনুযায়ী, ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত যে কোনো ব্যক্তি নাবালক। তবে আদালত কর্তৃক নাবালকের অভিভাবক নিযুক্ত হলে বা নাবালকের সম্পত্তি কোর্ট অফ ওয়ার্ডসের তত্ত্বাবধানে থাকলে ২১ বছর পর্যন্ত নাবালকত্ব বজায় থাকে।

নিকটবর্তী বন্ধু বা আসন্ন বন্ধু
(Next Friend)

প্রত্যেক নাবালকের নিজ নামে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির মাধ্যমে মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে। যে ব্যক্তির মাধ্যমে নাবালকের মোকদ্দমা দায়ের করা হবে তাকে বলা হয় ‘নিকটবর্তী বন্ধু’ (Next Friend)। (আদেশ-৩২, বিধি-১)

মোকদ্দমার অভিভাবক
(Guardian for the Suit)

যদি মোকদ্দমার বিবাদী একজন নাবালক হয়, আদালত নাবলকত্বের বিষয়ে সন্তুষ্ট হয়ে নাবালকের পক্ষে মোকদ্দমাটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য একজন যোগ্য ব্যক্তিকে ‘মোকদ্দমার অভিভাবক’ (Guardian for the Suit) হিসেবে নিয়োগ দেবেন।(আদেশ-৩২, বিধি-৩(১))

নিকটবর্তী বন্ধু কীভাবে হওয়া যায়
(How to be a Next Friend)

সাধারণভাবে নিকটবর্তী বন্ধু হওয়ার জন্য আলাদা কোনো আবেদন করার প্রয়োজন হয় না। দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৬, বিধি ১(ঘ) অনুযায়ী, যদি বাদী বা বিবাদী নাবালক বা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়, মোকদ্দমার আরজিতে তা উল্লেখ করে একটি বিবৃতি দিতে হবে।

নাবালকের নিকটবর্তী বন্ধু হিসেবে নিম্নলিখিত তিনটি অংশে বিষয়টি উল্লেখ করা সমীচীন:

১. বাদীর নাম–পরিচয় অংশে: মোকদ্দমায় বাদীর নামের স্থানে নাবালকের নাম ও বয়স এবং তার নিকটবর্তী বন্ধুর মাধ্যমে মামলা দায়ের করা হচ্ছে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

উদাহরণ: ‘ক’, পিতা-…, মাতা-…, বয়স ১৬ বছর, নাবালক বাদীর পক্ষে “খ”, পিতা-…, মাতা-…

২. আরজির বিবরণ অংশে: বাদীর নাবালকত্ব এবং নিকটবর্তী বন্ধুর মাধ্যমে মামলা দায়ের করা হচ্ছে তা উল্লেখ থাকবে।

উদাহরণ: যেহেতু বাদী ‘ক’ একজন নাবালক, সেহেতু দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ ৩২ অনুযায়ী তার স্বার্থরক্ষার জন্য অত্র মোকদ্দমা তার নিকটবর্তী বন্ধু ‘খ’-এর মাধ্যমে দায়ের করা হয়েছে।

৩. মোকদ্দমার হলফনামায়: নিকটবর্তী বন্ধু ঘোষণা করবেন যে তার কোনো স্বার্থ নাবালকের স্বার্থের বিরুদ্ধে নয় এবং তিনি সৎভাবে এবং নাবালকের কল্যাণে মোকদ্দমা পরিচালনা করবেন।

উদাহরণ: আমি হলফ করে ঘোষণা করছি যে, বাদী ‘ক’ একজন নাবালক হওয়ায় নিকটবর্তী বন্ধু হিসেবে আমি তার পক্ষে অত্র মোকদ্দমা দায়ের করছি। অত্র মোকদ্দমার বিষয়বস্তুতে বাদীর স্বার্থের পরিপন্থী কোনো স্বার্থ আমার নেই এবং আমি সম্পূর্ণ সৎভাবে বাদীর কল্যাণে মোকদ্দমা পরিচালনা করব।

মোকদ্দমার অভিভাবক কীভাবে নিয়োগ হয়
(How the Guardian for the Suit is Appointed)

যদি বাদী বা বিবাদী নাবালক বা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়, মোকদ্দমার আরজিতে তা উল্লেখ করতে হয়। নাবালক বিবাদীর পক্ষে মোকদ্দমার অভিভাবক নিয়োগের বিধি:

◉ বিবাদীর নাবালকত্বের বিষয়ে সন্তোষজনকভাবে নিশ্চিত হলে আদালত উক্ত নাবালকের জন্য একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে ‘মোকদ্দমার অভিভাবক’ নিয়োগ দেবেন। (আদেশ-৩২, বিধি-৩(১))

◉ নাবালকের পক্ষে অভিভাবক নিয়োগের জন্য বাদী নিজেই আবেদন করতে পারেন অথবা নাবালক বিবাদীর নামে তার পক্ষে অন্য কেউ আবেদন করতে পারেন। যে কোনো পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে মামলা-অভিভাবক নিয়োগের আদেশ পাওয়া যেতে পারে। (আদেশ-৩২, বিধি-৩(২))

◉ আবেদনের সঙ্গে একটি হলফনামা থাকতে হবে যাতে ঘোষণা করা হবে যে, মোকদ্দমার বিষয়বস্তুতে নাবালকের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো স্বার্থ প্রস্তাবিত অভিভাবকের নেই এবং তিনি উক্ত পদের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি। (আদেশ-৩২, বিধি-৩(৩))

◉ নাবালক ও তার অভিভাবককে নোটিশ দিয়ে শুনানি করার সুযোগ না পাওয়া পর্যন্ত এই বিধির আওতায় কোনো আদেশ প্রদান করা যাবে না। নোটিশ দিতে হবে নাবালক এবং নাবালকের এমন অভিভাবককে, যিনি এখতিয়ার সম্পন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত বা ঘোষিত হয়েছেন। যদি এমন কোনো অভিভাবক না থাকে, নোটিশ দিতে হবে নাবালকের পিতা বা অন্য স্বাভাবিক অভিভাবককে; পিতা বা অন্য স্বাভাবিক অভিভাবক না থাকলে নাবালক যার তত্ত্বাবধানে আছেন, তাকে নোটিশ দিতে হবে। নোটিশপ্রাপ্ত যে কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে উত্থাপিত আপত্তি শোনার পরই আদালত আদেশ দিতে পারবে। (আদেশ-৩২, বিধি-৩(৪))

◉ নিযুক্ত ব্যক্তি অবসর, অপসারণ বা মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত মোকদ্দমাটির আপিল, রিভিশন ও ডিক্রিজারীসহ সকল পর্যায়ে মোকদ্দমার অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। (আদেশ-৩২, বিধি-৩(৫))

◉ কোনো ব্যক্তিকে তার সম্মতি ছাড়া মোকদ্দমার অভিভাবক করা যাবে না। (আদেশ-৩২, বিধি-৪(৩))

◉ উপযুক্ত এবং অভিভাবক হতে রাজি আছেন এমন কাউকে পাওয়া না গেলে, আদালত তার যেকোনো কর্মকর্তাকে অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেন। (আদেশ-৩২, বিধি-৪(৪))

নাবালকের পক্ষে কে নিযুক্ত হতে পারেন
(Who Can Act for the Minor)

সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নাবালকের নিকটবর্তী বন্ধু বা মোকদ্দমার অভিভাবক হিসেবে কাজ করতে পারেন। (বিধি-৪(১))

নাবালকের পক্ষে কে নিযুক্ত হতে পারেন না
(Who Cannot Act for the Minor)

◉ নাবালকের স্বার্থের বিপরীতে বিরুদ্ধ স্বার্থ আছে এমন কোনো ব্যক্তি নাবালকের নিকটবর্তী বন্ধু বা মোকদ্দমার অভিভাবক নিযুক্ত হতে পারেন না। (বিধি ৪(১))

◉ যিনি মোকদ্দমার বিবাদী তিনি নাবালকের নিকটবর্তী বন্ধু হতে পারেন না। একইভাবে, যিনি মোকদ্দমার বাদী তিনি নাবালকের পক্ষে মোকদ্দমার অভিভাবক হতে পারেন না। (বিধি ৪(১))

◉ যদি কোনো এখতিয়ার সম্পন্ন কর্তৃপক্ষ নাবালকের পক্ষে কাউকে ইতোমধ্যে অভিভাবক নিযুক্ত করে থাকে তাহলে আদালত অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত অন্য কেউ নাবালকের নিকটবর্তী বন্ধু হতে পারবেন না অথবা অন্য কাউকে মোকদ্দমার অভিভাবক নিয়োগ দেয়া যাবে না। (বিধি ৪(২))

◉ যদি আদালতের বিবেচনায় মনে হয় নাবালকের কল্যাণার্থে অন্য কাউকে নিকটবর্তী বন্ধু হতে বা মামলার অভিভাবক নিয়োগ দেয়ার অনুমতি দেয়া যেতে পারে তাহলে কারণসমূহ নথিতে লিপিবদ্ধ করে আদালত এরূপ অনুমতি দিতে পারে।(বিধি ৪(২))

মোকদ্দমার কার্যকারীতা
(Effect of the Suit)

দেওয়ানি কার্যবিধির ১৪৭ ধারা অনুসারে, মোকদ্দমার যে কোনো কার্যধারায় নাবালকের পক্ষে তার নিকটবর্তী বন্ধু বা মোকদ্দমার অভিভাবক যে সম্মতি বা চুক্তিতে সম্মত হবেন, তা এমনভাবে কার্যকর হবে যেন নাবালক একজন সাবালক ব্যক্তি হিসেবে নিজেই সম্মত হয়েছেন। শর্ত হলো, সম্মতি বা চুক্তিটি আদালতের প্রকাশ্য অনুমতি নিয়ে হতে হবে।


Discover more from আইনের উন্মুক্ত পাঠশালা

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

একটি মন্তব্য করুন ⤵️

×
পরামর্শ প্রয়োজন? এখানে চাপুন!