দেওয়ানি কার্যবিধি ১৯০৮-এ মূল আইনের ১৫৮টি ধারার পাশাপাশি ৫টি তফসিল সংযুক্ত আছে, যার মধ্যে ৩টি কার্যকর এবং ২টি বাতিল। এ আইনটি অধ্যয়নের সময় ধারার সঙ্গে বিধিসমূহ মিলিয়ে পড়া উচিত।
ধারা এবং বিধির সংজ্ঞা
ধারা: মূল আইনের বিধানসমূহ যেসব সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলোকে বলা হয় ধারা।
বিধি: তফসিলভুক্ত বিধানসমূহ যেসব সংখ্যা দ্বারা প্রকাশ করা হয়েছে, সেগুলোকে বলা হয় বিধি। এই আইনের ২(১৮) ধারায় বলা হয়েছে, “বিধি বলতে প্রথম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত বিধি ও ফরমসমূহ অথবা ১২২ বা ১২৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী প্রণীত বিধিসমূহকে বোঝানো হয়।”
জ্ঞাতব্য: ধারার সঙ্গে বিধির বিরোধ দেখা দিলে ধারা প্রাধান্য পাবে।
সুপ্রিম কোর্টের বিধি প্রণয়ন ক্ষমতা
সুপ্রিম কোর্টের প্রতিটি বিভাগের এবং দেওয়ানি আদালতসমূহের কার্যপ্রণালী নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ‘পূর্ব প্রকাশের পর’ সুপ্রিম কোর্ট বিধি প্রণয়ন করতে পারবে এবং এইরূপ বিধির মাধ্যমে প্রথম তফসিলে উল্লিখিত সকল বা যে কোনো বিধি বাতিল, পরিবর্তন বা যোগ করতে পারবে। (ধারা-১২২)
জাতীয় সংসদের বিধি প্রণয়ন ক্ষমতা
১২২ নং ধারায় সুপ্রিম কোর্ট বিধি ‘প্রণয়ন করবে’ (shall make) না বলে ‘প্রণয়ন করতে পারে’ (may make) বলা হয়েছে। এর অর্থ হলো, সুপ্রিম কোর্টের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা বাধ্যতামূলক নয়, বরং ঐচ্ছিক। সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় আইন প্রণয়নের সর্বোচ্চ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে থাকে, যা প্রাকৃতিকভাবেই জাতীয় সংসদকে যে কোনো আইন বা বিধি প্রণয়নের অধিকার প্রদান করে। তাই ধারায় সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও স্বাভাবিকভাবেই অন্তর্নিহিত ক্ষমতাবলে জাতীয় সংসদ দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর বিধি প্রণয়ন করতে পারে।
পূর্ব প্রকাশ: আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ‘পূর্ব প্রকাশ’ বা ‘Previous Publication’ মানে হলো, জনসাধারণের মতামতের জন্য খসড়া আইন প্রকাশ করা।
বিধি প্রণয়ন কমিটি গঠন
◉ সুপ্রিম কোর্ট ১২২ ধারার আওতায় বিধি প্রণয়ন করতে চাইলে একটি বিধি কমিটি (Rule Committee) গঠন করতে হবে। (ধারা-১২৩(১))
◉ বিধি কমিটিতে সুপ্রিম কোর্টের ৩ জন বিচারপতি ও ২ আইনজীবী এবং হাই কোর্টের অধীনস্থ দেওয়ানি আদালতের ১ জন বিচারকসহ মোট ৬ জন সদস্য থাকবে। সুপ্রিম কোর্টের ৩ জন বিচারপতির মধ্যে অনন্ত একজন বিচারপতি থাকবেন যিনি পূর্বে জেলা জজ হিসেবে ন্যূনতম তিন বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। (ধারা-১২৩(২))
◉ প্রধান বিচারপতি বিধি কমিটির সদস্যদের নিয়োগ দিবেন এবং একজনকে সভাপতি নির্বাচিত করবেন। প্রধান বিচারপতি নিজেও বিধি কমিটির সদস্য হতে পারেন, সেক্ষেত্রে তিনি নিজেই হবেন বিধি কমিটির সভাপতি। (ধারা-১২৩(৩))
◉ কমিটির প্রত্যেক সদস্যদের মেয়াদ নির্ধারণ করবেন প্রধান বিচারপতি, এবং যেকোনো সদস্য অবসরে গেলে, পদত্যাগ করলে, মারা গেলে বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে পড়লে নতুন সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন। (ধারা-১২৩(৪))
◉ প্রধান বিচারপতি বিধি কমিটির জন্য একজন সচিব নিয়োগ করবেন। সরকার যেভাবে নির্ধারণ করবেন কমিটির সচিব সে অনুযায়ী বেতন গ্রহণ করবেন। (ধারা-১২৩(৫))
বিধি প্রণয়ন পদ্ধতি
◉ বিধি কমিটি প্রথম তফসিলভুক্ত বিধিগুলোর কোন পরিবর্তন, বাতিল বা নতুন বিধি যোগ করার প্রস্তাবের উপর সুপ্রিম কোর্টে একটি প্রতিবেদন পেশ করবেন এবং সুপ্রিম কোর্ট সেই প্রতিবেদন বিবেচনায় নিবে। (ধারা-১২৪)
◉ প্রণীত বিধিসমূহ রাষ্ট্রপতির পূর্ব অনুমোদনের শর্তাধীন থাকবে। (ধারা-১২৬)
◉ রাষ্ট্রপতি অনুমোদন দেয়ার পর প্রণিত বিধিসমূহ সরকারি গেজেটে প্রকাশ করতে হবে। গেজেট প্রকাশের তারিখ থেকে অথবা যদি তারিখ উল্লেখ থাকে সেই তারিখ থেকে প্রণিত বিধিসমূহ প্রথম তফসিলের অন্তর্ভুক্ত বিধি হিসেবে কার্যকর হবে। (ধারা-১২৭)
তফসিলসমূহের কার্যকারিতা
প্রথম তফসিল: প্রথম তফসিলের বিধিসমূহ মূল দেওয়ানি কার্যবিধিরই অংশ হিসেবে বলবৎ হবে। তবে মূল আইন দ্বারা বাতিল বা সংশোধন করা হলে এর কার্যকারিতা থাকবে না বা সংশোধিত অংশ কার্যকর হবে। (ধারা-১২১)
দ্বিতীয় তফসিল: সালিস আইন, ১৯৪০-এর ৪৯ নম্বর ধারা দ্বারা এ তফসলটি বাতিল করা হয়েছে। সালিস আইন, ২০০১-এর ৫৯(১) ধারায় ‘১৯৪০ সালের সালিস আইন‘ বাতিল করা হয়েছে। ১৯৪০ সালের সালিস আইনটি কার্যত বাতিল হলেও জেনারেল ক্লজেজ অ্যাক্ট, ১৮৯৭ অনুযায়ী দ্বিতীয় তফসিলটি বাতিল বলেই গণ্য।
তৃতীয় তফসিল: তৃতীয় তফসিলের বিধানাবলী কালেক্টর কর্তৃক ডিক্রি জারির সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যদি সরকার ৬৮ নম্বর ধারার আওতায় ডিক্রি জারীকরণ কালেক্টরের কাছে হস্তান্তর করে। (ধারা-৬৯)
চতুর্থ তফসিল: চতুর্থ তফসিল দ্বারা কতিপয় আইন সংশোধনের বিধান রাখা হয়েছে। এই তফসিলে উল্লিখিত আইনসমূহ সংশোধিত হবে এবং চতুর্থ কলামে যে সংশোধনের উল্লেখ থাকবে, শুধুমাত্র সেটুকুই সংশোধিত হবে। (ধারা-১৫৫)
চতুর্থ তফসিল দ্বারা কোর্ট ফি অ্যাক্ট, ১৯১৪-এর প্রথম তফসিলের অনুচ্ছেদ- ১ এবং দ্বিতীয় তফসিলের অনুচ্ছেদ- ১১ ও ১৯-এ কিছু সংশোধন আনা হয়েছে।
পঞ্চম তফসিল: সেকেন্ড রিপিলিং ও অ্যামেন্ডিং অ্যাক্ট, ১৯১৪-এর ৩ নম্বর ধারা ও দ্বিতীয় তফসিল দ্বারা বাতিল করা হয়েছে।
মিফতাহুর রহমান, অ্যাডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট
Discover more from আইনের উন্মুক্ত পাঠশালা
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
