মানসিক অক্ষম ব্যক্তি কর্তৃক মোকদ্দমা

আইনে প্রত্যেক ব্যক্তির আদালতে যাওয়ার অধিকার থাকলেও, কিছু ব্যক্তি মানসিক অবস্থার কারণে নিজের আইনগত স্বার্থ নিজে রক্ষা করতে সক্ষম হন না। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে দেওয়ানি কার্যবিধিতে মানসিক অক্ষম বা দুর্বল ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।

মানসিক অক্ষম ব্যক্তির জন্য নাবালকের বিধান

দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর আদেশ–৩২-এর বিধি–১৫ অনুযায়ী, একই আদেশের ১ থেকে ১৪ নং বিধি পর্যন্ত উল্লেখিত নাবালকের মোকদ্দমা সংক্রান্ত বিধানসমূহ যতদূর পর্যন্ত প্রয়োগ করা সম্ভব (so far as they are applicable), ততদূর পর্যন্ত মানসিক অক্ষম ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

মানসিক অক্ষম ব্যক্তি তাকে বলা হবে—

◉ বিচারক্রমে আদালত যাকে মানসিক অক্ষম বলে সাব্যস্ত করেছে; এবং

◉ বিচারক্রমে মানসিক অক্ষম সাব্যস্ত না করা হলেও, আদালতের অনুসন্ধানে যখন দেখা যায় যে মোকদ্দমাকারী ব্যক্তি বা যার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা করা হয়েছে, তিনি মানসিক অক্ষমতা বা দুর্বলতার কারণে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে অক্ষম।

সংশ্লিষ্ট আলোচনা
মোকদ্দমার পক্ষসমূহ: বাদী ও বিবাদী
যৌথ বাদী বা বিবাদীর মোকদ্দমা
নাবালকের পক্ষে বা বিপক্ষে মোকদ্দমা
মোকদ্দমার বিষয়বস্তু
মোকদ্দমার স্বার্থ

পর্যবেক্ষণ: বিধি–১৫-এর ফলে মানসিক অক্ষম ব্যক্তিকে কার্যত নাবালকের সঙ্গে একই আইনগত অবস্থানে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ—

◉ মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি নিজ নামে সরাসরি মোকদ্দমা পরিচালনা করতে পারবেন না;

◉ তার পক্ষে একজন উপযুক্ত প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি ‘নিকটবর্তী বন্ধু’ হয়ে বাদী হিসেবে মোকদ্দমা দায়ের করবেন;

◉ তিনি যদি বিবাদী হন, তাহলে আদালত তার পক্ষে একজন ‘মোকদ্দমার অভিভাবক’ নিয়োগ করবেন;

◉ নিকটবর্তী বন্ধু ও মোকদ্দমার অভিভাবক নিয়োগ, যোগ্যতা, অযোগ্যতা, নোটিশ, হলফনামা ও আদালতের অনুমতির বিষয়ে নাবালকের ক্ষেত্রে যেসব বিধান রয়েছে, সেগুলোই মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।

মানসিক অক্ষম ব্যক্তির সংজ্ঞা

তামাদি আইন, ১৯০৮-এর ধারা ৬–এ আইনগত অক্ষম ব্যক্তির আওতায় নাবালক, মানসিক বিকারগ্রস্ত ও জড়বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমান অধিকার এবং আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান হওয়ায়, আইনের পরিভাষায় যেকোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে অবজ্ঞাসূচক শব্দ ব্যবহার পরিহার করা বাঞ্ছনীয়।

দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ–৩২–এ of unsound mind এবং mental infirmity শব্দগুচ্ছ ব্যবহৃত হয়েছে।
তামাদি আইনে মানসিক অক্ষম ব্যক্তির জন্য insaneidiot শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

Unsound mind শব্দগুচ্ছের হুবহু বা নিকটবর্তী কোনো বাংলা প্রতিশব্দ নেই। Sound mind দ্বারা মনের স্বাভাবিক ও নির্বিঘ্ন অবস্থাকে বোঝানো হয়। Unsound mind বলতে এমন মানসিক অবস্থাকে বোঝায়, যেখানে স্বাভাবিক ও নির্বিঘ্ন মানসিক ভারসাম্য বিদ্যমান নেই। দেওয়ানি কার্যবিধিতে unsound mind-এর অর্থ ‘মানসিক অক্ষমতা’।

Mental infirmity শব্দগুচ্ছের আক্ষরিক অর্থ ‘মানসিক দুর্বলতা’। কোনো জটিল রোগ বা বার্ধক্যজনিত কারণে অনেক মানুষের স্মৃতিশক্তি বা চিন্তার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়—এই অবস্থাকে মানসিক দুর্বলতা বলা যায়।

Insane বলতে অপ্রকৃতিস্থ বা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য ব্যক্তিকে বোঝায়। অনেকেই insane শব্দটির আক্ষরিক অনুবাদ ‘উন্মাদ’ বা ‘পাগল’ হিসেবে করেন। তবে এর সবচেয়ে সাবলীল বাংলা প্রতিশব্দ হলো ‘মানসিক বিকারগ্রস্ত’।

Idiot শব্দটি গ্রিক idiōtēs থেকে এসেছে, যার অর্থ ছিলো ‘সাধারণ ব্যক্তি’ বা ‘ব্যক্তিগত নাগরিক’, যারা রাষ্ট্রীয় কাজে অংশ নিত না। পরবর্তীতে এটি ‘অজ্ঞ’ অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এর প্রচলিত বাংলা প্রতিশব্দ হলো ‘হাবা’ বা ‘জড়বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি’। বর্তমানে বিশ্বের অনেক দেশই আইনের পরিভাষা হিসেবে idiot শব্দটি পরিত্যাগ করেছে।

নাবালক ও মানসিক অক্ষম ব্যক্তির সাদৃশ্য ও পার্থক্য

নাবালক ও মানসিক অক্ষম উভয় ব্যক্তিই দেওয়ানি মোকদ্দমার পক্ষ হতে না পারার মূল কারণ হলো তারা আইনগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষম।

নাবালকের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকা সত্ত্বেও তিনি মোকদ্দমার পক্ষ হতে পারেন না, কারণ তার মানসিক বিকাশ পরিপূর্ণ হয়নি। অন্যদিকে, মানসিক অক্ষমতা একজন ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

মানসিক অক্ষম ব্যক্তি নাবালক বা প্রাপ্তবয়স্ক যে কোনো বয়সের হতে পারেন। তার অক্ষমতার কারণ মানসিক রোগ বা দুর্বলতা। অন্যদিকে, নাবালকের কোনো মানসিক রোগ নেই; সে মানসিকভাবে সুস্থ হলেও আইনগতভাবে অপরিণত।


Discover more from আইনের উন্মুক্ত পাঠশালা

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

একটি মন্তব্য করুন ⤵️

×
পরামর্শ প্রয়োজন? এখানে চাপুন!