দেওয়ানী মোকদ্দমার ধাপসমূহ ও পরীক্ষা প্রস্তুতি

বিজেএস, বার কাউন্সিল ও এলএলবি পরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রে দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ এমন একটি আইন যেটি যতই পড়বেন, মনে হবে যেন এর কোন শেষ নেই। জটিলতা আরও বাড়ে যখন দেখা যায় বারবার রিভিশন দেয়ার পরও অনেক কিছুই মনে থাকে না এবং এক বিষয়ের সঙ্গে অন্য বিষয় গুলিয়ে যায়।

এই আইনের বিভিন্ন বিষয় সহজে মনে রাখার জন্য এবং একটি বিষয় যেন আরেকটি বিষয়ে সঙ্গে গুলিয়ে না যায় তার জন্য একটি দেওয়ানি মোকদ্দমা দায়ের হতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এবং তার পরবর্তী কার্যক্রমের বিভিন্ন স্তর অনুসারে ধারাবাহিকভাবে সাজিয়ে রিভিশন দিলে পরীক্ষা প্রস্তুতি ফলপ্রসূ হবে এবং ভবিষ্যতে আইন পেশায় কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে।

দেওয়ানি কার্যবিধি সাজানোর ক্ষেত্রে ধারা ও বিধির বিষয়বস্তুসমূহকে প্রথমেই আমরা তিনটি ভাগে বিভক্ত করতে পারি:

প্রথম ভাগ: মোকদ্দমা দায়েরের পূর্ববর্তী পর্যায়;
দ্বিতীয় ভাগ: মোকদ্দমা দায়ের হতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ও পরবর্তী কার্যক্রম;
তৃতীয় ভাগ: মোকদ্দমার বিবিধ বিষয়াবলী।

প্রথম ভাগ: মোকদ্দমা দায়েরের পূর্ববর্তী পর্যায়

দেওয়ানি মোকদ্দমা সাধারণত আদালতে দায়ের করা হয়, এবং এটি থানায় বা পুলিশের কাছে দায়ের করা যায় না। মোকদ্দমা দায়েরের পূর্বে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ রয়েছে যা একজন আইনজীবীকে ঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে।

১. মোকদ্দমার বাদী ও বিবাদীর একটি তালিকা তৈরি করা, একাধিক পক্ষকে একসাথে বাদী বা বিবাদী করার ক্ষেত্রে বিধান কী, তা জানা। যদি মামলার বাদী বা বিবাদীর তালিকায় কারো নাম বাদ যায় বা ভুলবশত কারো নাম ঢুকে যায়, তাহলে করণীয় কী সেটি জানা।
২. মোকদ্দমার বাদী বা বিবাদীর মধ্যে কেউ নিঃস্ব, নাবালক, উন্মাদ বা আইনগত অক্ষম কিনা, এবং যদি থাকে, তাদের বিষয়ে কী বিধান সেটি জানা।
৩. মোকদ্দমাটি প্রতিনিধিত্বমূলক বা স্বার্থবিহীন মোকদ্দমা হলে সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া।
৪. মোকদ্দমাটি কিভাবে সাজানো হবে তার খসড়া প্রস্তুত (ড্রাফটিং) করা।
৫. মোকদ্দমার কার্যকারণ ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত জানা এবং মোকদ্দমা দায়েরের জন্য একাধিক কার্যকারণ আছে কিনা, সেটা জানা।
৬. মোকদ্দমার বাদী বা বিবাদী যদি আদালতে হাজির হতে অপরাগ হন, তাহলে তার পক্ষে হাজিরা দেয়ার জন্য আইনগত প্রতিনিধি বা আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থা করা।
৭. কোন আদালতে মামলাটি দায়ের করা হবে, তা নির্ধারণ করা।
৮. আরজি লেখা, আরজির সঙ্গে মামলার তাঁয়েদাদ অনুযায়ী কোর্ট ফি নির্ধারণ করা, সমন প্রেরণের জন্য সমন, খাম, এডি ও আরজির ফটোকপি প্রস্তুত করা।
৯. সঠিক এখতিয়ার সম্পন্ন আদালতের শেরেস্তায় আরজি দাখিলের মাধ্যমে মোকদ্দমা রুজু করা।

দ্বিতীয় ভাগ: মোকদ্দমা দায়ের হতে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ও পরবর্তী কার্যক্রম

আদালতের শেরেস্তায় আরজি দাখিলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি দেওয়ানি মোকদ্দমার কার্যক্রম শুরু হয়। দেওয়ানি মোকদ্দমার কার্যধারাকে তিনটি ধাপে বিভক্ত করা হয়।

(ক) প্রি ট্রায়াল স্টেজ বা বিচার পূর্ববর্তী পর্যায়:
১. মোকদ্দমাটির গ্রহণযোগ্যতা যাচাই।
২. সমন ইস্যু ও জারি।
৩. বিবাদী পক্ষের লিখিত জবাব দাখিল।
৪. পক্ষসমূহের হাজিরা: বিবাদী পক্ষের গরহাজিরায় এক তরফা বিচারের আদেশ, বাদীর গরহাজিরায় মোকদ্দমা খারিজ।
৫. মধ্যস্থতা: সমঝোতা ও মোকদ্দমা প্রত্যাহার।
৬. পক্ষসমূহের জবানবন্দি গ্রহণ।
৭. উদঘাটন ও পরিদর্শন।
৮. দলিলাদি দাখিল, অন্তরীন, ফেরত।
৯. স্বীকৃতি ও অস্বীকার।
১০. ইস্যু গঠন।

(খ) ট্রায়াল স্টেজ বা বিচারিক পর্যায়:
১. প্রথম শুনানিতে মোকদ্দমা নিষ্পত্তি।
২. সাক্ষিকে সমন।
৩. মুলতবি।
৪. সাক্ষ্য গ্রহণ।
৫. যুক্তি তর্ক।
৬. রায় ও ডিক্রি।

(গ) পোস্ট ট্রায়াল স্টেজ বা বিচার পরবর্তী পর্যায়:
১. ডিক্রি জারি মোকদ্দমা দায়ের।
২. ডিক্রি জারির পদক্ষেপসমূহ।
৩. কালেক্টর কর্তৃক ডিক্রি জারি।
৪. গ্রেফতার ও ক্রোক।
৫. নিলাম বিক্রয়।
৬. আপিল।
৭. জারি ও কার্যধারা স্থগিতকরণ।
৮. আদেশের বিরুদ্ধে আপিল।
৯. আপিল আদালতের এখতিয়ার।
১০. আপিল আদালতের ক্ষমতা ও কার্যক্রম।
১১. আপিলে মুলতবি।
১২. আপিল খারিজের বিরুদ্ধে প্রতিকার।
১৩. রিভিশন।
১৪. লীভ টু রিভিশন।
১৫. রিভিউ।
১৬. রেফারেন্স।

তৃতীয় ভাগ: মোকদ্দমার বিবিধ বিষয়াবলী

১. আদালতের সহজাত ক্ষমতা: কোয়াশমেন্ট (Quashment) বা বাতিলকরণ।
২. যে কোন পক্ষের মৃত্যু, বিবাহ ও দেউলিয়া হয়ে যাওয়া।
৩. কমিশন গঠন।
৪. হলফনামা।
৫. রায়ের পূর্বে গ্রেফতার ও ক্রোক।
৬. সুদ, মধ্যবর্তী মুনাফা বা অবৈধ দখল মুনাফা, ক্ষতিপূরণ।
৭. অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা ও অন্তবর্তী আদেশ।
৮. রিসিভার নিয়োগ।
৯. হস্তান্তরযোগ্য দলিল (Negotiable Instruments) সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত কার্যপ্রণালী।


Discover more from আইনের উন্মুক্ত পাঠশালা

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

একটি মন্তব্য করুন ⤵️

×
পরামর্শ প্রয়োজন? এখানে চাপুন!