সাজেশন: বার কাউন্সিল ও বিজেএস পরীক্ষা
দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮, ধারা: ৯
দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ধারা-৯ দেওয়ানি প্রকৃতির সকল মোকদ্দমা বিচার করার জন্য আদালতকে ক্ষমতা প্রদান করে, যদি না আইনের মাধ্যমে তাদের বিচারিক এখতিয়ার স্পষ্টভাবে বা অন্তর্নিহিতভাবে বারিত করা হয়। ধারা-৯ এ বলা হয়েছে,
The Courts shall (subject to the provisions herein contained) have jurisdiction to try all suits of a civil nature excepting suits of which their cognizance is either expressly or impliedly barred.
অর্থাৎ, যদি প্রকাশ্যভাবে বা অন্তর্নিহিতভাবে আমলে নেওয়া বারিত না হয় তবে এই আইনের বিধান সাপেক্ষে আদালতসমূহের সকল ধরনের দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমার বিচার করার এখতিয়ার থাকবে।
এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো ‘দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমা’ (Suit of a Civil Nature) এর ধারণা। এই ধারণা ও এর আওতা অনুধাবন দেওয়ানি আইনের অধ্যয়নের জন্য অপরিহার্য।
‘মামলা’ ও ‘মোকদ্দমা’র পার্থক্য
(Difference Between ‘Case’ and ‘Suit’)
আইনের পরিভাষায় “মামলা” এবং “মোকদ্দমা” শব্দ দুটির মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ‘মামলা’ একটি বিস্তৃত পরিভাষা যা যেকোনো প্রকারের আইনি বিরোধ বা বিচারিক প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে। এটি দেওয়ানি, ফৌজদারি, প্রশাসনিক, শ্রম, ভূমি – যেকোনো ধরনের আইনি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ফৌজদারি মামলা, একটি দেওয়ানি মামলা, বা একটি শ্রম মামলা।
‘মামলা’ শব্দটি একটি সাধারণ আইনি বিরোধের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। তবে, বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ব্যবহারিক অর্থে ‘মামলা’ শব্দটি প্রায়শই ফৌজদারি মামলার সমার্থক হিসেবে এবং ‘মোকদ্দমা’ শব্দটি দেওয়ানি মামলার সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই পার্থক্যটি আইন শিক্ষা ও অনুশীলনের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
মামলা (Case): বাংলাদেশের আইনজীবীগণ ব্যবহারিক অর্থে এবং সাধারণ আইনি পরিভাষায়, ‘মামলা’ শব্দটি প্রায়শই ফৌজদারি মামলার সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত করেন। অর্থাৎ, যখন কোনো অপরাধমূলক কাজের জন্য রাষ্ট্র বা কোনো ব্যক্তি কর্তৃক আদালতে অভিযোগ দায়ের করা হয় এবং তার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন তাকে সাধারণত ‘ফৌজদারি মামলা’ বা সংক্ষেপে ‘মামলা’ বলা হয়।
মোকদ্দমা (Suit): এটি একটি সুনির্দিষ্ট আইনি পরিভাষা যা শুধুমাত্র দেওয়ানি প্রকৃতির বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। যখন কোনো ব্যক্তি তার দেওয়ানি অধিকার (যেমন, সম্পত্তি বা পদের অধিকার) প্রয়োগ বা লঙ্ঘনের প্রতিকার চেয়ে আদালতে লিখিত আরজি (plaint) দাখিল করেন, তখন সেই প্রক্রিয়াকে ‘মোকদ্দমা’ বলা হয়।
সারসংক্ষেপ: শিক্ষাগত ও তাত্ত্বিক অর্থে, সকল মোকদ্দমাই মামলা, কিন্তু সকল মামলাই মোকদ্দমা নয়। ‘মোকদ্দমা’ হলো ‘মামলা’র একটি বিশেষ প্রকার, যা দেওয়ানি অধিকারের সাথে সম্পর্কিত।
দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমা
(Suit of a Civil Nature)
দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ নম্বর ধারার ব্যাখ্যায় “দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমা” কী, তা সুস্পষ্ট করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে:
A suit in which the right to property or to an office is contested is a suit of a civil nature, notwithstanding that such right may depend entirely on the decision of questions as to religious rites or ceremonies.
অর্থাৎ, যে মোকদ্দমায় সম্পত্তির অধিকার অথবা একটি পদের অধিকার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় তাকেই দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমা বলা হবে, যদিওবা পদের অধিকারটি সম্পূর্ণরূপে ধর্মীয় রীতি বা অনুষ্ঠানের প্রশ্নে কোন সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল হয়।
সম্পত্তির অধিকার
(Right to Property)
সাধারণভাবে, সম্পত্তি বলতে মানুষের মালিকানাধীন সেইসব জিনিসকে বোঝায় যা আর্থিক মূল্যে পরিমাপযোগ্য এবং হস্তান্তরযোগ্য। সম্পত্তি স্থাবর (যেমন জমি, দালানকোঠা) বা অস্থাবর (যেমন টাকা, আসবাবপত্র), বস্তুগত (tangible) বা নির্বস্তুগত (intangible) হতে পারে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫২ নম্বর অনুচ্ছেদে “সম্পত্তি” (Property) এর একটি বিস্তৃত সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে, যা ধারা-৯ এর ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক:
“সম্পত্তি” বলিতে সকল স্থাবর ও অস্থাবর, বস্তুগত ও নির্বস্তুগত সম্পত্তি, বাণিজ্যিক ও শিল্পগত উদ্যোগ এবং অনুরূপ সম্পত্তি বা উদ্যোগের সহিত সংশ্লিষ্ট যে কোন স্বত্ব বা অংশ অন্তর্ভুক্ত হইবে।
এর অর্থ, জমি, দালানকোঠা, অর্থ, শেয়ার, ট্রেডমার্ক, কপিরাইট, ব্যবসার সুনাম, এবং অন্য যেকোনো আইনগতভাবে স্বীকৃত অধিকার বা অংশ যা অর্থনৈতিক মূল্য ধারণ করে, সবই সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
সম্পত্তির অধিকার নিয়ে যেকোনো বিরোধ, যেমন মালিকানা, দখল, উত্তরাধিকার, বন্ধক, বা চুক্তিভঙ্গজনিত ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি, দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমার আওতাভুক্ত।
পদের অধিকার
(Right to an Office)
“পদ” বলতে একটি নির্দিষ্ট দায়িত্বপূর্ণ অবস্থানকে বোঝায়, যা কোনো ব্যক্তি গ্রহণ করেন এবং সেই অনুযায়ী তার কর্তব্য পালন করেন। এটি সরকারি বা বেসরকারি চাকরি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পদ, কোনো সমিতির পদ, কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের (যেমন, মসজিদ, মন্দির, গির্জা) ধর্মীয় পদ (যেমন, ইমাম, পুরোহিত, সেবায়েত, মোতোয়াল্লী) হতে পারে। পদের অধিকার অর্থের বিনিময়ে সরাসরি হস্তান্তরযোগ্য নয়, বরং যোগ্যতা, নির্বাচন, নিয়োগ, বা উত্তরাধিকারের ভিত্তিতে অর্জিত হয়।
এ বিষয়ে ভারতীয় দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ ধারায় ১৯৭৬ সালে ব্যাখ্যা-২ সংযুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে,
For the purposes of this section, it is immaterial whether or not any fees are attached to the office referred to in Explanation I or whether or not such office is attached to a particular place.
তার মানে, কোনো পদের সঙ্গে পারিশ্রমিক (যেমন বেতন বা ভাতা) জড়িত থাকুক বা না থাকুক, অথবা পদটি কোনো নির্দিষ্ট স্থানের সাথে সংযুক্ত থাকুক বা না থাকুক, পদের অধিকার সংক্রান্ত বিরোধ একটি দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমা হিসেবে বিবেচিত হবে।
দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমা: ধর্মীয় বিষয়ে মূলনীতি ও সীমা
(Suit of a Civil Nature: Principles and Limits on Religious Matters)
সংবিধানের ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’ নিশ্চিত করা হয়েছে। এই স্বাধীনতার অধীনে নিজ ধর্মের অনুসারী ছাড়া রাষ্ট্র, আদালত বা অন্য কোন ব্যক্তি কোন ধর্মীয় রীতি বা অনুষ্ঠানের প্রশ্নে কোন ‘সিদ্ধান্ত’-এর বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এই প্রেক্ষিতে দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমার সংজ্ঞায় ধর্মীয় রীতি বা অনুষ্ঠানের প্রশ্ন জড়িত থাকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর একটি গভীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিদ্যমান।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
(Historical Context)
ব্রিটিশ শাসনামলে যখন ভারতীয় উপমাদেশে ইংরেজি বিচার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়, তখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় পদ নিয়ে ধর্মীয় আইন (যেমন মুসলিম ব্যক্তিগত আইন, হিন্দু ব্যক্তিগত আইন) দ্বারা পরিচালিত সম্পত্তি ও পদ সংক্রান্ত অসংখ্য বিরোধ বিদ্যমান ছিল। তখন আইনপ্রণেতাদের কাছে এটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসে যে, কীভাবে একটি সাধারণ বিচার ব্যবস্থা এই ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের বিরোধগুলিকে পরিচালনা করবে, যেখানে মানুষের দেওয়ানি অধিকারগুলি প্রায়শই ধর্মীয় প্রথা ও রীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। এই প্রেক্ষাপটে, ধারা-৯-এর ব্যাখ্যাটি সংযোজিত হয়েছিল এই বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য যে:
◉ আদালতের এখতিয়ারের ব্যাপ্তি: এ ব্যাখ্যাটি সংযোজনের অন্যতম কারণ হলো, দেওয়ানি আদালতকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক নয়, বরং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান বা রীতির উপর নির্ভরশীল দেওয়ানি বিরোধের মিমাংসা করারও ক্ষমতা দেয়া। এ ব্যাখ্যাটি এটি নিশ্চিত করে যে, শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষঙ্গ থাকার কারণে কোনো বৈধ দেওয়ানি অধিকার আদালতের এখতিয়ারের বাইরে চলে যাবে না।
◉ ধর্মীয় বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ এড়ানো: একই সাথে, এই ব্যাখ্যাটি পরোক্ষভাবে আদালতকে বিশুদ্ধ ধর্মতত্ত্ব, ধর্মীয় বিশ্বাস বা আচার-অনুষ্ঠানের ‘সঠিকতা’ বা ‘ভুলত্ব’ নিয়ে সরাসরি রায় প্রদান থেকে বিরত রাখে। আদালত এখানে ধর্মীয় মতবাদকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না।
অর্থাৎ, দেওয়ানি আদালত ধর্মীয় রীতি বা অনুষ্ঠানের সারমর্মের উপর নয়, বরং প্রাসঙ্গিক অধিকার এবং পদচ্যুতি বা অধিকার লঙ্ঘনের প্রাসঙ্গিক আইনি প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত নেয়। আদালত যাচাই করে দেখে যে পদচ্যুতির প্রক্রিয়াটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিধিমালা, প্রচলিত রীতি, এবং প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ করেছে কিনা, এবং এর ফলে বাদীর কোনো দেওয়ানি অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কিনা। এটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ নয়, বরং ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত দেওয়ানি অধিকারের সুরক্ষার একটি আইনি প্রক্রিয়া।
মিফতাহুর রহমান, অ্যাডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট
Discover more from আইনের উন্মুক্ত পাঠশালা
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

মাশাল্লাহ