সাজেশন: বার কাউন্সিল ও বিজেএস পরীক্ষা
দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮, ধারা: ৩, ৬, ৯
দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭, ধারা: ৩, ৯, ১৮, ১৯
দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ধারা-৯ এ বলা হয়েছে, “যদি প্রকাশ্যভাবে বা অন্তর্নিহিতভাবে আমলে নেওয়া বারিত না হয় তবে এই আইনের বিধান সাপেক্ষে আদালতসমূহের সকল ধরনের দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমার বিচার করার এখতিয়ার থাকবে।”
৯ ধারার এই বিধানে অন্তত ৪টি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে:
◉ দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমা;
◉ আদালতসমূহের বিচার করার এখতিয়ার থাকবে;
◉ এই আইনের বিধান সাপেক্ষে;
◉ আমলে নেওয়া প্রকাশ্যভাবে বা অন্তর্নিহিতভাবে বারিত না হলে।
দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমা সম্পর্কে আগের লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আজকে আলোচনা করবো আদালতসমূহ নিয়ে। ৯ ধারায় আদালতসমূহকে যে কোনো দেওয়ানি প্রকৃতির মোকদ্দমা বিচার করার এখতিয়ার দেয়া হয়েছে, পাশাপাশি এখতিয়ার প্রয়োগের শর্তও জুড়ে দেয়া হয়েছে।
প্রথমত, এই আইন অর্থাৎ দেওয়ানি কার্যবিধি যেভাবে বিধান দিবে আদালতসমূহের এখতিয়ার সেভাবে নির্ধারিত হবে।
দ্বিতীয়ত, সকল এখতিয়ার থাকা সত্বেও আদালসমূহ কোনো একটি মোকদ্দমার বিচার করতে পারবে না যদি সেটি আইনে বারিত বা নিষিদ্ধ হয়।
দেওয়ানি আদালতের গঠন
৯ ধারায় ‘আদালতসমূহ’ বলতে দেওয়ানি আদালতসমূহকে বোঝানো হয়েছে। দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭-এর ধারা-৩ অনুসারে ৫ ধরনের দেওয়ানি আদালত থাকবে, যথা-
(ক) জেলা জজ আদালত (the Court of the District Judge),
(খ) অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত (the Court of the Additional District Judge),
(গ) যুগ্ম-জেলা জজ আদালত (the Court of the Joint District Judge),
(ঘ) জ্যেষ্ঠ দেওয়ানি জজ আদালত (the Court of the Senior Civil Judge),
(ঙ) দেওয়ানি জজ আদালত (the Court of the Civil Judge)।
এসব আদালতের বিচারকের সংখ্যা সরকার পরিবর্তন করতে পারে। অর্থাৎ, দেওয়ানি আদালতসমূহের বিচারকের সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়। (ধারা-৪, দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭)
দেওয়ানি আদালতের অধীনস্থতা
জেলা আদালত হাই কোর্ট বিভাগের অধীন এবং অন্যান্য আদালত জেলা আদালতের অধীন হবেন। ক্ষুদ্র বিষয়ক আদালক জেলা আদালত ও হাই কোর্ট বিভাগের অধীন হবেন। (ধারা-৩, দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮)
হাই কোর্ট বিভাগের তদারকিতে থেকে জেলা জজ তার এখতিয়ারাধীন অঞ্চলে এ আইনের আওতাধীন সকল দেওয়ানী আদালতসমূহকে প্রশানসিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে। (ধারা-৯, দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭)
দেওয়ানি আদালতের আর্থিক এখতিয়ার
দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ১৫ ধারার বিধান সাপেক্ষে জেলা জজ ও যুগ্ম-জেলা জজ সকল ধরনের দেওয়ানি মোকদ্দমা গ্রহণের আদি এখতিয়ার রাখেন। (ধারা-১৮, দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭)
সিনিয়র সিভিল জজ আদালত ২৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত এবং সিভিল জজ আদালত ১৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মূল্যমানের যে কোনো দেওয়ানি মোকদ্দমা গ্রহণের এখতিয়ার রাখেন। (ধারা-১৯(১), দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭)
আর্থিক এখতিয়ার কিভাবে নির্ধারিত হয়?
দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর ধারা-৬ অনুসারে দেওয়ানি আদালত আদি আর্থিক এখতিয়ারের বাইরে কোনো মোকদ্দমা বিচারের এখতিয়ার রাখে না। এ আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, “প্রতিটি মোকদ্দমা বিচার করার ক্ষমতাসম্পন্ন সর্বনিম্ন আদালতে দায়ের করতে হবে।”
দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭-এর ধারা-১৮ অনুসারে জেলা জজ ও যুগ্ম-জেলা জজ যে কোনো মূল্যমানের মোকদ্দমা বিচার করতে পারেন। অর্থাৎ, এ দুটি আদালতের আর্থিক এখতিয়ার অসীম। অন্যদিকে ধারা-১৯ অনুসারে, সিনিয়র সিভিল জজ ২৫ লক্ষ টাকার বেশি নয় এমন যে কোন মূল্যমানের মোকদ্দমা এবং সিভিল জজ ১৫ লক্ষ টাকার বেশি নয় এমন যে কোনো মূল্যমানের মোকদ্দমা বিচারের এখতিয়ার রাখেন।
২৫ লক্ষ টাকার নিচে যে কোনো মূল্যমানের মোকদ্দমা বিচারের এখতিয়ার সিনিয়র সিভিল জজ আদালতকে দেয়া হলেও দেওয়ানি কার্যবিধির ১৫ ধারায় ক্ষমতাসম্পন্ন সর্বনিম্ন আদালতে মোকদ্দমা দায়েরের বিধান থাকায় এ আদালত ১৫ লক্ষ টাকা বা তার কম মূল্যমানের মোকদ্দমা আমলে নিতে পারবে না। অর্থাৎ ধারা-১৫ অনুসারে ১৫ লক্ষ টাকা বা তার কম মূল্য মানের মামলা আমলে নেয়ার একমাত্র এখতিয়ার সিভিল জজের উপর বর্তায়। একই কারণে ২৫ লক্ষ টাকা বা তার চেয়ে কম মূল্যমানের মোকদ্দমা আমলে নেয়ার এখতিয়ার যুগ্ম জেলা জজ আদালতের নেই।
জেলা জজ, অতিরিক্ত জেলা জজ ও যুগ্ম-জেলা জজ তিনটি আদালতেরই আর্থিক এখতিয়ার অসীম হওয়া সত্বেও জেলা জজ ও অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত কোনো দেওয়ানি মোকদ্দমাই আমলে নিতে পারবে না, কারণ যুগ্ম-জেলা জজ আদালত এ দুই আদালতের চেয়ে নিম্ন আদালত। এ কারণে ২৫ লক্ষ টাকার বেশি মূল্য মানের মোকদ্দমা আমলে নেয়ার এখতিয়ার শুধুমাত্র যুগ্ম জেলা জজের ওপর বর্তায়।
লক্ষ্যণীয়: জেলা জজ আদালত ও অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের ক্ষমতা ও এখতিয়ার সমান হওয়ায় দেওয়ানি আদালত আইনে আলাদাভাবে অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের আর্থিক এখতিয়ারের বিধান দেয়া হয়নি।
এ আইনের বিধানের সাপেক্ষ
আদালতসমূহের গঠন, কোন আদালত কোন আদালতের অধীন, কোন আদালতের কত টাকা পর্যন্ত মোকদ্দমার বিচার করার এখতিয়ার থাকবে, কোন আদালতে আপিল করতে হবে ইত্যাদি বিষয়ে দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭-এ বিধান দেওয়া আছে। দেওয়ানি কার্যবিধির ৯ ধারায় ‘এ আইনের বিধান সাপেক্ষে’ শব্দগুচ্ছ দ্বারা বোঝানো হচ্ছে যে, দেওয়ানি আদালত আইন, ১৮৮৭-এর অধীনে গঠিত হলেও এখতিয়ার ও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতসমূহ দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর মুখাপেক্ষী।
আমলে নেওয়া প্রকাশ্যভাবে বা অন্তর্নিহিতভাবে বারিত না হলে
রেস জুডিকাটা, তামাদি মেয়াদ উত্তীর্ণ, আঞ্চলিক এখতিয়ারের বাইরে, বিষয়গতভাবে মোকদ্দমাটি দেওয়ানি প্রকৃতির নয় ইত্যাদি নানা কারণে একটি মোকদ্দমা আমলে নেওয়া বারিত হতে পারে। এ বিষয়গুলো পরবর্তীতে বিভিন্ন পর্বে আলোচনায় আসবে।
মিফতাহুর রহমান, অ্যাডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট
Discover more from আইনের উন্মুক্ত পাঠশালা
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
