প্রচলিত দেওয়ানি আইনসমূহে “যৌথ বাদীর মোকদ্দমা” বা “যৌথ বিবাদীর মোকদ্দমা” নামে কোনো নির্দিষ্ট পরিভাষা নেই। তবে বিষয়টি বুঝার সুবিধার জন্য এভাবে অভিব্যক্তি ব্যবহার করেছি।
যৌথ বাদীর মোকদ্দমা
(Suit by Joinder of Plaintiffs)
সাধারণ নিয়ম হল, একই বিষয়বস্তুতে যতজন ব্যক্তির একই স্বার্থ থাকবে, তাদের সবাইকে মোকদ্দমার পক্ষ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। মোকদ্দমার বিষয়বস্তু বা স্বার্থ ভিন্ন হলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে ভিন্ন ভিন্ন মোকদ্দমা দায়ের করতে হবে। তবে, যৌথ বাদীর মোকদ্দমার ক্ষেত্রে বিষয়বস্তু বা স্বার্থ আলাদা আলাদা হলেও, একাধিক ব্যক্তি একত্রিত হয়ে একটি মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন।
সংশ্লিষ্ট আলোচনা
মোকদ্দমার পক্ষসমূহ: বাদী ও বিবাদী
যৌথ বাদী বা বিবাদীর মোকদ্দমা
মোকদ্দমার বিষয়বস্তু
মোকদ্দমার স্বার্থ
একাধিক ব্যক্তি যৌথভাবে বাদী হয়ে মোকদ্দমা দায়ের করার শর্ত:
১. কোনো মোকদ্দমায় যেসব ব্যক্তির প্রতিকার পাওয়ার অন্তত একটি অধিকার আছে বলে দাবি করা হয়, তারা সবাই ওই মোকদ্দমায় যৌথ বাদী হতে পারেন। এক্ষেত্রে প্রতিকারের অধিকারটি হতে পারে যৌথ কিংবা পৃথক অথবা বিকল্প অধিকার।
২. দাবিকৃত অধিকারটি হতে হবে একটি নির্দিষ্ট কাজ বা লেনদেন থেকে অথবা একই কার্যধারায় সংঘটিত ধারাবাহিক কয়েকটি কাজ বা লেনদেন থেকে।
৩. যৌথ বাদী হওয়া ব্যক্তিরা আলাদাভাবে মোকদ্দমা করলে উত্থাপিত আইনগত বা ঘটনাগত প্রশ্নটি একই হবে। (আদেশ-১, বিধি-১)
উদাহরণ:
১. একটি ডেভেলপার কোম্পানি ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু করে এবং ভূমির মালিকদের ন্যায্য মূল্য পরিশোধ করে না। ক, খ এবং গ পৃথক তিনটি জমির মালিক। তারা যৌথভাবে মামলা করতে পারে।
২. একটি বিল্ডিং নির্মাণের ফলে ক, খ এবং গ-এর বাড়িতে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। তারা একত্রে একটি মামলা করতে পারে।
৩. ঝ একটি ঋণ চুক্তির অধীনে ক, খ ও গ থেকে পৃথক পৃথক অংকের টাকা ধার করে, টাকা ফেরত দেয় না। ক, খ ও গ একত্রে মামলা করতে পারে। কারণ এসব ঋণ একই চুক্তির অংশ।
৪. একটি ডেভেলপার কোম্পানি একটি প্রকল্পে ১০০টি প্লট বিক্রি করার প্রতিশ্রুতি দেয়। ক, খ ও গ চুক্তি অনুযায়ী অর্থ প্রদান করেন, কিন্তু ডেভেলপার কোম্পানি প্লট হস্তান্তর করে না। এখানে প্রতিটি প্লট বিক্রি পৃথক লেনদেন হলেও, সব লেনদেন একটি প্রকল্পের অংশ। তাই একটি কার্যধারার সংঘটিত ধারাবাহিক লেনদেন হিসেবে ক, খ ও গ যৌথভাবে বাদি হয়ে একটি মোকদ্দমা করতে পারে।
শর্ত: একাধিক বাদী যৌথভাবে মোকদ্দমা করার পর আদালত যদি মনে করেন, কোনো একজন বাদী বিচারকার্যকে বিলম্বিত করছেন, তাহলে আদালত পৃথক বিচারের আদেশ দিতে পারেন। (আদেশ-১, বিধি-২)
যৌথ বিবাদীর মোকদ্দমা
(Suit by Joinder of Defendants)
মূলত যৌথ বাদীর মোকদ্দমার সঙ্গে যৌথ বিবাদীর মোকদ্দমার বিধানগত কোনো পার্থক্য নেই। এখানে শুধুমাত্র বাদী পক্ষের বিধানগুলো বিপরীতভাবে বিবাদী পক্ষের হয়ে বলা হয়েছে।
একটি মোকদ্দমায় একাধিক ব্যক্তির যৌথভাবে বিবাদী হওয়ার শর্ত:
১. কোনো মোকদ্দমায় যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার অন্তত একটি অধিকার আছে বলে দাবি করা হয়, তারা সবাই ওই মোকদ্দমায় যৌথ বিবাদী হতে পারেন। এক্ষেত্রে বিরুদ্ধ অধিকারটি হতে পারে যৌথ কিংবা পৃথক অথবা বিকল্প অধিকার।
২. দাবিকৃত অধিকারটি হতে হবে একটি নির্দিষ্ট কাজ বা লেনদেন থেকে অথবা একই কার্যধারায় সংঘটিত ধারাবাহিক কয়েকটি কাজ বা লেনদেন থেকে।
৩. যৌথ বিবাদী হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আলাদাভাবে মোকদ্দমা করলে উত্থাপিত আইনগত বা ঘটনাগত প্রশ্নটি একই হবে। (আদেশ-১, বিধি-৩)
প্রতিকার ও দায় নিরূপণের বিধান
কোনো মোকদ্দমায় একাধিক ব্যক্তি যৌথভাবে বাদী বা বিবাদী হলে আদালত কীভাবে রায় দেবেন তা আদেশ-১ এর ৪ নং বিধিতে বর্ণিত হয়েছে।
রায় প্রদানের পদ্ধতি নিম্নরূপ-
(ক) যৌথ বাদীদের জন্য: আদালত রায় দেওয়ার সময় যে বাদী যতটুকু প্রতিকার পাওয়ার অধিকারী, তাকে ততটুকু অধিকার প্রদান করবে।
(খ) যৌথ বিবাদীদের জন্য: আদালত রায় দেওয়ার সময় যে বিবাদীর বিরুদ্ধে যতটুকু দায় প্রমাণিত হয়, তার ওপর সেই পরিমাণ দায় আরোপ করবে।
এই বিধান যৌথ বাদী ও বিবাদীদের স্বতন্ত্র অধিকার এবং দায় নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত হয়েছে।
বহুবাদী-বিবাদী ও যৌথ বাদী-বিবাদীর পার্থক্য
বহুবাদী বা বহুবিবাদীর মোকদ্দমা আর যৌথ বাদী বা যৌথ বিবাদীর মোকদ্দমা এক বিষয় নয়। আগেই বলেছি একই বিষয়বস্তুতে যতজন ব্যক্তির একই স্বার্থ থাকবে, তাদের সবাইকে একই মোকদ্দমায় পক্ষভুক্ত করতে হয়। এ ধরণের মোকদ্দমাই হলো বহু বাদী বা বহু বিবাদীর মোকদ্দমা। কিন্তু মোকদ্দমার বিষয়বস্তু বা স্বার্থ ভিন্ন হওয়া সত্বেও একাধিক ব্যক্তি একত্রিত হয়ে অথবা একাধিক ব্যক্তিকে একত্রে বিবাদী করে যে মোকদ্দমা দায়ের বা বিচার করা হয় তাকে বলা হবে যৌথ বাদী বা যৌথ বিবাদীর মোকদ্দমা।
দুই প্রকারের মোকদ্দমার মৌলিক পার্থক্য হলো, প্রথম প্রকারের মোকদ্দমার বিষয়বস্তু ও স্বার্থ একই, কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারের মোকদ্দমার বিষয়বস্তু ও স্বার্থ আলাদা।
মিফতাহুর রহমান, অ্যাডভোকেট, ঢাকা জজ কোর্ট
Discover more from আইনের উন্মুক্ত পাঠশালা
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
